কলকাতা: বাংলায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই একের পর এক ঝোড়ো সিদ্ধান্ত নিয়ে চলেছে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার। অনুপ্রবেশকারীদের রুখতে ইতিমধ্যেই জেলায় জেলায় ডিটেনশন বা হোল্ডিং সেন্টার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। কিন্তু এবার যা হতে চলেছে, তা বোধহয় কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। উত্তরপ্রদেশ এবং অসমের দেখানো পথেই কি এবার হাঁটতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ? জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কি এবার অত্যন্ত কড়া ও বাধ্যতামূলক কোনও আইন আনতে চলেছে শুভেন্দু সরকার? পরিবার পিছু সন্তান সংখ্যা বেঁধে দিতে কি নয়া বিলের খসড়া তৈরি হচ্ছে নবান্নে? বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের একটি বিস্ফোরক মন্তব্যের পর থেকেই এখন এই সমস্ত প্রশ্ন নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়েছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে।
আসল জল্পনার সূত্রপাত হয়েছে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের এক চাঞ্চল্যকর আবেদনের পর। জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে জনসংখ্যাকে এবার নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। তাঁর দাবি, একদিকে লাগাতার অনুপ্রবেশ এবং অন্যদিকে উদ্বাস্তুর চাপ—এই দুইয়ের জেরে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ইতিমধ্যেই প্রায় সাড়ে দশ কোটি ছুঁতে চলেছে। এই পরিস্থিতিতে আমরা যদি নিজেরাই ঘরে ঘরে সাতটা বা আটটা করে সন্তান জন্ম দিয়ে এই সংখ্যা বৃদ্ধিতে মদত দিতে থাকি, তবে রাজ্যের ভবিষ্যৎ অন্ধকার। সেই কারণেই বাংলায় এবার জন্ম নিয়ন্ত্রণ আইনকে সম্পূর্ণ বাধ্যতামূলক করা দরকার বলে মনে করেন তিনি। শমীক ভট্টাচার্য আরও জানান, এই দাবি তাঁর একার নয়, রাজ্যের সাধারণ মানুষও এটাই চান। আর সেই কারণেই খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সামনেই তিনি এই প্রস্তাবটি রেখেছেন এবং বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখার জন্য সরকারের কাছে জোরালো আবেদন জানিয়েছেন।
ভারতের ‘ন্যাশনাল কমিশন অন পপুলেশন-এর টেকনিক্যাল গ্রুপের’ সাম্প্রতিক সমীক্ষা ও পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা প্রায় ১০ কোটি ৬ লক্ষের গণ্ডি পার করে গিয়েছে। গোটা দেশের নিরিখে জনসংখ্যার দিক থেকে বিচার করলে উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র এবং বিহারের ঠিক পরেই চতুর্থ স্থানে রয়েছে এই রাজ্য। অথচ ভৌগোলিক আয়তনের দিক থেকে বাংলা অনেকটাই ছোট। ক্ষমতায় আসার আগে থেকেই বিজেপি বারেবারে অভিযোগ তুলে সরব হয়েছে যে, সীমান্ত পেরিয়ে আসা অনুপ্রবেশকারীরা সুপরিকল্পিতভাবে বাংলার জনবিন্যাস বদলে দিচ্ছে। নতুন সরকার আসার পর সেই অনুপ্রবেশকারীদের হঠাতে ইতিমধ্যেই প্রশাসনিক স্তরে কড়া পদক্ষেপ শুরু হয়েছে। ঠিক এই আবহেই সরাসরি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিল বা ‘টু-চাইল্ড পলিসি’ আনার এই প্রস্তাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা।
যদি সত্যিই শুভেন্দুর সরকার অসম ও উত্তরপ্রদেশের পথ অনুসরণ করে, তবে বাংলার বুকে এক ঐতিহাসিক প্রশাসনিক রদবদল ঘটতে চলেছে। কারণ, অসম সরকারের কড়া নীতি অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তির দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে তিনি সে রাজ্যে কোনও সরকারি চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন না। এমনকি কর্মরত সরকারি কর্মচারীদের জন্যও এই নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও সেখানে চা বাগান শ্রমিক বা নির্দিষ্ট কিছু অনগ্রসর সম্প্রদায়ের জন্য নিয়মে সামান্য শিথিলতা রয়েছে। অন্যদিকে, যোগী আদিত্যনাথের উত্তরপ্রদেশেও ২০২১ সালে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ বিলের যে খসড়া আনা হয়েছিল, সেখানে পরিষ্কার বলা হয় যে, দুইয়ের বেশি সন্তান থাকলে সরকারি চাকরি তো মিলবেই না, পাশাপাশি চাকরিতে থাকলেও মিলবে না কোনও প্রমোশন বা পদোন্নতি। এমনকি পঞ্চায়েত বা পুরসভা নির্বাচনে লড়ার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হয়। এখন দেখার, শমীক ভট্টাচার্যের এই মেগা প্রস্তাবকে সিলমোহর দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বাংলায় এমন কোনও যুগান্তকারী ও কড়া আইনের ব্লু-প্রিন্ট সামনে আনেন কিনা।
[TECHTARANGA-POST:9640]
হিডেন স্টোরিজ নিউজ
Leave a comment