০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home পশ্চিমবঙ্গ সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার: লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড়ে মোহনায় এখন ভক্তি-বিশ্বাসের মহাসঙ্গম
পশ্চিমবঙ্গ

সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার: লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ভিড়ে মোহনায় এখন ভক্তি-বিশ্বাসের মহাসঙ্গম

Share
Share

শীতের মিঠে রোদ আর ভোরের কুয়াশা মেখে সাগরতটে এখন শুধুই জনজোয়ার। শুরু হয়ে গিয়েছে ঐতিহ্যবাহী গঙ্গাসাগর মেলা। কপিল মুনির আশ্রমের ঘণ্টাধ্বনি আর শাঁখের আওয়াজে মুখরিত দ্বীপের চারপাশ। দেশের কোণা কোণা থেকে আসা লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর সমাগমে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এই প্রান্তবিন্দু এখন যেন এক ‘মিনি ভারত’।

কথায় বলে, ‘সব তীর্থ বারবার, গঙ্গাসাগর একবার’। সেই টানেই রাজস্থানের মরুপ্রান্তর থেকে দক্ষিণের কন্যাকুমারী— সব পথের ধুলো এসে মিশেছে সাগরের বালুকাবেলায়। মঙ্গলবার রাত থেকেই মকর সংক্রান্তির পুণ্যস্নানের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে। হাড়কাঁপানো ঠান্ডা উপেক্ষা করেই মুড়িগঙ্গার চরে থিকথিক করছে ভিড়। কেউ এসেছেন মানত পূরণ করতে, কেউ বা স্রেফ এক ডুব দিয়ে মোক্ষলাভের আশায়। কপিল মুনির মন্দিরে দীর্ঘ লাইন, হাতে পূজার ডালি আর মুখে ‘জয় গঙ্গা মাই’ ধ্বনি— সব মিলিয়ে এক অলৌকিক পরিবেশ।

এত বড় মাপের জমায়েত সামলানো প্রশাসনের কাছে এক বিশাল চ্যালেঞ্জ। তবে এবার নিরাপত্তায় কোনো ফাঁক রাখা হয়নি। আকাশ থেকে নজরদারি চালাচ্ছে ড্রোন, আর সমুদ্রের বুকে টহল দিচ্ছে কোস্ট গার্ড ও স্পিড বোট। মেলা প্রাঙ্গণজুড়ে মোতায়েন করা হয়েছে হাজার হাজার পুলিশ কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবক। সিসিটিভি ক্যামেরায় মুড়ে ফেলা হয়েছে গোটা দ্বীপ। ডট প্লট ট্র্যাকিং থেকে শুরু করে কিউআর কোড ভিত্তিক গাইডেন্স— প্রযুক্তির ব্যবহার এবার চোখে পড়ার মতো। কোনো পুণ্যার্থী যাতে পথ না হারান বা সমস্যায় না পড়েন, তার জন্য তৈরি করা হয়েছে একাধিক কন্ট্রোল রুম।

এদিকে, গঙ্গাসাগর মেলাকে কেন্দ্র করে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর যাতায়াত নির্বিঘ্ন ও সুশৃঙ্খল রাখতে পরিষেবা বাড়াল পূর্ব রেলের শিয়ালদহ ডিভিশন। 

নির্ধারিত ২৩টি ট্রেনের পাশাপাশি যাত্রীদের ভিড়ের কথা মাথায় রেখে আরও ৪টি বিশেষ ট্রেন চালু করা হয়েছে। এর ফলে গঙ্গাসাগর মেলায় যাওয়ার জন্য মোট ট্রেন পরিষেবার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল ২৭টি।

পূর্ব রেলের তরফে জানানো হয়েছে, কাকদ্বীপ ও নামখানা রুটে যাত্রীসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জরুরি ভিত্তিতে অতিরিক্ত ট্রেন চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

আগের চেয়ে সাগর মেলা এখন অনেক বেশি আধুনিক। যাতায়াতের সুবিধার জন্য ভেসেল পরিষেবা বাড়ানো হয়েছে, বসানো হয়েছে পর্যাপ্ত শৌচালয় এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা। বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে পরিচ্ছন্নতার ওপর। ‘নির্মল গঙ্গাসাগর’ গড়ার লক্ষ্যে সাফাই কর্মীদের বিশাল বাহিনী রাতদিন কাজ করে চলেছে। প্লাস্টিক বর্জ্য রুখতে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। পাশাপাশি, পুণ্যার্থীদের জন্য অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র এবং অ্যাম্বুল্যান্সের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

শুধু ভক্তি নয়, গঙ্গাসাগর মেলা মানেই এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। নাগা সন্ন্যাসীদের বিভূতিমাখা চেহারা থেকে শুরু করে বাউল গান, হরেক রকমের পসরা সাজিয়ে বসা দোকানদার— সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মায়াবী মেজাজ। ধুনির ধোঁয়া আর ধূপের গন্ধে ম ম করছে বাতাস। রাতের বেলা যখন হাজার হাজার প্রদীপ জ্বলে ওঠে সাগরের জলে, তখন সেই দৃশ্য হার মানায় যে কোনো কল্পনাকে।

সব মিলিয়ে, গঙ্গাসাগর মেলা ২০২৬ তার নিজস্ব মহিমায় ভাস্বর। ভিড় আছে, কোলাহল আছে, কিন্তু সেই সব ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে কোটি কোটি মানুষের অটুট বিশ্বাস। এই মেলা কেবল ধর্মীয় আচার নয়, এ যেন ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের এক জীবন্ত উদাহরণ।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *