০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home বিশ্ব দক্ষিণ এশিয়া ৬ দিনে ১০০টি রেসকিউ মিশন, নেপাল “দেবদূত” কে ?
দক্ষিণ এশিয়াবিশ্ব

৬ দিনে ১০০টি রেসকিউ মিশন, নেপাল “দেবদূত” কে ?

Share
Share

কাঠমান্ডু : পাহাড়ি আঁকাবাঁকা উপত্যকা জুড়ে একের পর এক ধস, তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়া ঘরবাড়ি, আর নিচে গর্জে ওঠা কাদা-জলের স্রোত। প্রকৃতির এই তাণ্ডবলীলার মাঝে যখন মৃত্যুর হাতছানি, ঠিক তখনই নেপালের আকাশ চিরে আশার আলো হয়ে দেখা দিলেন এক নারী। তিনি প্রিয়া অধিকারী।নেপালের প্রথম মহিলা হেলিকপ্টার ক্যাপ্টেন। হিমালয় ঘেরা প্লাবিত ও বিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে মাত্র ছয় দিনে প্রায় ১০০টিরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযান (Rescue Mission) চালিয়ে আজ তিনি গোটা নেপালের কাছে এক জলজ্যান্ত ‘দেবদূত’।

সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ফ্ল্যাশ ফ্লাড ও ভূমিধসে নেপালের রসুয়া জেলার তিমুরে অঞ্চল সহ বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কার্যত শ্মশান। সেখানে জীবিতদের উদ্ধার করা এবং মৃতদেহ ফিরিয়ে আনার কাজে দিন-রাত এক করে কপ্টার উড়িয়ে যাচ্ছেন ৪১ বছর বয়সী এই পাইলট। সিএনএন-এর অ্যান্ডারসন কুপারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে প্রিয়া জানান, ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের চেয়েও এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হওয়া বেশি চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ সংকীর্ণ উপত্যকার মধ্যে এই রূপ ধ্বংসলীলা নেভিগেট করা অত্যন্ত বিপজ্জনক।

পরিবেশবিদ্যা থেকে ৬,২০০ মিটার উঁচুর আকাশে

প্রিয়ার এই পাইলট হয়ে ওঠার পথটা খুব সহজ ছিল না। তিনি প্রথমে পরিবেশবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করেছিলেন এবং পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন কেবিন ক্রুর কাজ। কিন্তু একটি হেলিকপ্টার ‘জয়রাইড’-এর অভিজ্ঞতা তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। উড়ার অদম্য স্বপ্ন নিয়ে তিনি পাড়ি দেন ফিলিপিন্সে, সেখানে কপ্টার চালনার কঠিন প্রশিক্ষণ শেষ করেন। ২০১৭ সালে ফুল-টাইম পাইলট হিসেবে কাজ শুরু করার পর দ্রুত নিজেকে ‘হাই-অ্যাল্টিটিউট রেসকিউ’-এর বিশেষজ্ঞ হিসেবে গড়ে তোলেন। হিমালয়ের চরম প্রতিকূল আবহাওয়ায় ৬,২০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত গিয়ে আহত পর্বতারোহীদের প্রাণ বাঁচানোর অগাধ রেকর্ড রয়েছে তাঁর ঝুলিতে।

মৃত্যুকূপ তিমুরে ও প্রিয়ার জীবনবাজি

চলতি উদ্ধারকার্যে তিমুরের আকাশ ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ ও বিপজ্জনক। একসঙ্গে প্রায় ২০টি হেলিকপ্টার সেখানে কাজ করছিল। অনেক সময় ৫-৬টি কপ্টারকে প্রায় একই সঙ্গে অতিক্ষুদ্র জায়গায় ল্যান্ড করাতে হচ্ছিল। সামান্য ভুলেই ঘটে যেতে পারত বড় দুর্ঘটনা। রেডিওতে ক্রমাগত যোগাযোগ বজায় রেখে নিখুঁত দক্ষতায় কপ্টার সামলেছেন প্রিয়া।

স্থলভাগের বিপজ্জনক পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি জানান, উপর থেকে মাটি শক্ত মনে হলেও নিচে জমে ছিল নরম কাদার মারাত্মক স্তর। এমন অনেক জায়গা ছিল যেখানে কপ্টারের ইঞ্জিন বন্ধ করাও নিরাপদ ছিল না। রানিং ইঞ্জিনে কপ্টার ব্যালেন্স করে রেখেই বেঁচে যাওয়া মানুষদের দ্রুত ভেতরে তুলে নিয়ে শূন্যে উড়াল দিতে হয়েছে তাঁকে।

চোখের জল মুছে বেঁচে থাকার বার্তা

আকাশ থেকে কাদা ও ধ্বংসস্তূপের মাঝে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা মৃতদেহ দেখে শিউরে উঠেছিলেন প্রিয়া। মৃতদেহ বহন করার জন্য বডি ব্যাগের জরুরি প্রয়োজন দেখা দিয়েছিল সেই এলাকায়। কিন্তু এত মৃত্যুর মাঝেও যাঁরা বেঁচে ছিলেন, তাঁদের হাসিমুখই প্রিয়ার মূল শক্তি হয়ে ওঠে। প্রথম দুই দিনে ২০০-র বেশি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে যান তিনি ও তাঁর দল। প্রিয়া আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “প্রতিবার যখনই আমি অবতরণ করতাম, চারপাশে মানুষকে হাত নাড়াতে দেখতাম। আমি তাঁদের শুধু একটাই কথা বলতাম—’তোমরা বেঁচে গেছ, আর কোনো ভয় নেই।'”

আমেরিকান-ইন্ডিয়ান তরুণী রাধিকার নিখোঁজ বাবা-মা কিংবা ঈশা ফাউন্ডেশনের কর্মীদের উদ্ধারের চেষ্টা করতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন প্রিয়া। টানা উড্ডয়নে শরীর ক্লান্ত, চোখ ঘুমে ঢুলুঢুলু; তবুও থামেননি তিনি। প্রিয়ার কথায়, “আমরা মারাত্মক ক্লান্ত, কিন্তু এই চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্যই তো আমরা তৈরি হয়েছি।” আকাশে মেঘের ঘনঘটা আর নিচে মৃত্যুর ফাঁদ—তারই মাঝে নেপালের আকাশে মানবতার নতুন ইতিহাস লিখে চলেছেন ক্যাপ্টেন প্রিয়া অধিকারী।


হিডেন স্টোরিজ নিউজ 

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *