কলকাতা : বঙ্গোপসাগরে ঘনীভূত নিম্নচাপ অঞ্চল গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করতেই বদলে গেল রাজ্যের আবহাওয়াচিত্র। সোমবার থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টি মঙ্গলবার ছাড়িয়ে বুধবারও রূপ নিল টানা বর্ষণে। ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টির জেরে কলকাতা তো বটেই, তছনছ হয়ে পড়েছে দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলির গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কোথাও কোমরজল ঠেলে চলছে শহরের নিত্যযাত্রা, আবার কোথাও উথাল-পাথাল নদের তোড়ে ভেঙে পড়েছে সেতু, জলে ভেসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে হাজার হাজার গ্রাম। সব মিলিয়ে নিম্নচাপের থাবায় একপ্রকার ছন্নছাড়া দক্ষিণবঙ্গের জনজীবন।
জলে থৈ থৈ কলকাতা, স্তব্ধ যান চলাচল
বুধবার সকাল থেকেই কলকাতা ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় দফায় দফায় ঝেঁপে বৃষ্টি নামে। কলকাতা পুরসভার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টের মাত্র তিন ঘণ্টার মধ্যেই পামার ব্রিজ এলাকায় বৃষ্টি হয়েছে ৫৬ মিলিমিটার! এছাড়া তপসিয়ায় ৪৬, বালিগঞ্জে ৪৪ এবং মোমিনপুরে ৪৩ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে।
ঝড়জল ও টানা পশলা বৃষ্টির জেরে উত্তর থেকে দক্ষিণ কলকাতার বহু গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা দ্রুত জলমগ্ন হয়ে পড়ে। সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ, আমহার্স্ট স্ট্রিট, থিয়েটার রোড, ওয়াটার লু স্ট্রিটের মতো ব্যস্ত রাস্তায় জল জমে একাকার। দক্ষিণ কলকাতার উডবার্ন পার্ক রোড, হসপিটাল রোড, এটিএম রোড, জাস্টিস চন্দ্রমাধব রোড, হেস্টিংস পার্ক রোড, উত্তীর্ণর সামনের অংশ, পিটিএস এবং পোর্ট এরিয়াতেও হাঁটু জল জমে যায়। ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত কালীঘাট, হরিশ মুখার্জি স্ট্রিট এবং ন্যাশনাল লাইব্রেরির সামনের রাস্তা জলের তলায় তলিয়ে যায়।
বাঘাযতীন উড়ালপুলের নিচে ও ঠাকুরপুকুরের বিভিন্ন গলিতে দেখা দেয় ব্যাপক জলজট। হেস্টিংসের কাছে উড়ালপুল থেকে নামতেই জমা জলে আটকে পড়ে গাড়ি। ফলে দিনভর চরম যানজটের মুখে পড়তে হয় বাস ও অফিসযাত্রীদের। রাস্তায় গণপরিবহনের সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকায় দুর্ভোগের পারদ চড়ে বহুগুণ। হাওড়ার একাধিক নিচু এলাকাও বৃষ্টির জমা জলে ভাসতে দেখা যায়।
বাঁকুড়ায় ভাঙল সেতু, নদী ও কজওয়ে গিলে বিচ্ছিন্ন ২০টি গ্রাম
নিম্নচাপের সবচেয়ে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে বাঁকুড়া ও পুরুলিয়া জেলায়। লাগাতার অতি ভারী বর্ষণে উথাল-পাথাল নদীর জল ঢুকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে একের পর এক অঞ্চল। পাত্রসায়র ব্লকের জামকুড়ি গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় দুমনি খালের প্রবল স্রোতে স্রেফ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে ৩ বছর আগে তৈরি একটি ভাসা সেতু। এই সেতুটি ভেঙে পড়ায় পাত্রসায়র ব্লক সদর থেকে একপ্রকার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন অন্তত ২০টি গ্রামের মানুষ।
অন্যদিকে, দ্বারকেশ্বর নদের জলস্তর হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরোপুরি ডুবে গিয়েছে ভাদুল ও মীনাপুরের দুটি পৃথক কজওয়ে। মেজিয়ায় মাতাবেল খালের জল উপচে কজ়ওয়ে ডুবে যাওয়ায় মেজিয়া-ছাতনা রাজ্য সড়কে সমস্ত যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন। ওই কজ়ওয়ে দিয়ে প্রতিদিন বাঁকুড়া শহরে যাতায়াত করতেন বালিয়াড়া ও সোনাতপল-সহ বিস্তীর্ণ এলাকার বাসিন্দারা। কজওয়েগুলির ওপর দিয়ে দ্বারকেশ্বরের জল প্রবল বেগে বইতে থাকায় যাতায়াত পুরোপুরি থমকে গেছে।
বীরভূমে বাঁধ থেকে ছাড়া হচ্ছে জল, প্লাবনের আতঙ্ক
একই পরিস্থিতি বীরভূমেও। একটানা বৃষ্টির কারণে সাঁথিয়া ও সিউড়ি সংলগ্ন ময়ূরাক্ষী নদীর জলস্তর বিপদসীমার দিকে এগোচ্ছে। বুধবার সকালেই ময়ূরাক্ষী নদীর ওপর অবস্থিত ডিম পাড়া বাঁধ থেকে ৯,০০০ কিউসেক জল ছাড়া হয়েছে। এর ফলে নদীর তীরবর্তী নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হওয়ার তীব্র আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জেলা প্রশাসন সূত্রে খবর, বৃষ্টি যদি এভাবেই চলতে থাকে তবে বাঁধ থেকে জল ছাড়ার পরিমাণ আরও বাড়ানো হতে পারে, যা নতুন করে বন্যার আতঙ্ক তৈরি করছে নদীপাড়ের বাসিন্দাদের মনে।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ
Leave a comment