পাটনা: পাহাড়ের কোল থেকে সূর্যাস্ত দেখতে কেমন লাগে !
তা দেখতেই টিউশন ফেরতা গিয়েছিল দশম শ্রেণির দুই পড়ুয়া। কিন্তু ফেরার পথে তাদের কপালে এমন মার জুটবে, তা তারা কল্পনাও করতে পারেনি। বিহারের জামুই জেলায় এক নাবালিকা এবং তার বন্ধুকে ঘিরে ধরে বেধড়ক মারধর, চরম হেনস্থা ও শ্লীলতাহানির ঘটনায় তোলপাড় দেশজুড়ে। ঘটনার ভিডিও সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই, রাজ্যোর ভেঙে পড়া আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা নিয়ে সরব হয়েছেন বিরোধীরা। এমন ভয়াবহ ঘটনার মধ্যেও বিহারের এক মন্ত্রীর অসংবেদনশীল মন্তব্য বিতর্ককে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
পুলিশ সূত্রে খবর, গত শনিবার জামুই এবং লক্ষ্মীসরাই সংযোগকারী রাস্তা থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে মারওয়া পাহাড়ে ঘুরতে যায় দুই স্কুলপড়ুয়া। ফেরার পথে নির্জন রাস্তায় সাত-আট জনের একদল যুবক তাদের স্কুটার আটকে ‘নীতি পুলিশি’ শুরু করে। প্রকাশিত ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, মুখ ঢাকা যুবকদের কাছে হাত জোড় করে বারবার ক্ষমা চাইছিল কিশোর-কিশোরী। এমনকি, ওই এলাকায় আর কোনওদিন আসবে না বলেও কাকুতি-মিনতি করে তারা। কিন্তু দুষ্কৃতীরা কিশোরকে অমানবিকভাবে বেধড়ক মারধর করে এবং কিশোরীকে অশালীন স্পর্শের পাশাপাশি টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।
ঘটনার ভিডিও ভাইরাল হতেই জামুইয়ের মহকুমা পুলিশ আধিকারিক দীপ্তি মোনালির নেতৃত্বে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (সিট) গঠন করা হয়। পুলিশ সিসিটিভি ও ভিডিও ফুটেজ দেখে সাতজনকে চিহ্নিত করে, যার মধ্যে ইতিমধ্যেই তিনজনকে পাকড়াও করা হয়েছে। বিহার পুলিশের এডিজি (আইনশৃঙ্খলা) কে এস অনুপম জানান, ভারতীয় ন্যায় সংহিতা ও পকসো (POCSO) আইনের একাধিক ধারায় মামলা রুজু করে কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তদের মধ্যে কয়েকজন নাবালকও রয়েছে।
তবে এই নৃশংস অপরাধের মধ্যেও বিতর্ক বাড়িয়ে তুলেছেন বিহারের মন্ত্রী শ্রাবণ কুমার। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি দাবি করেন, “পৃথিবী থেকে তো আর অপরাধ পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি, দু-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটতেই পারে।” মন্ত্রীর এই জাতীয় মন্তব্যে রাজ্য রাজনীতিতে চরম অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে জেডিইউ নেতা উমেশ কুশওয়াহা পরে সাফাই দিয়ে জানান, কথার ভুলে এই মন্তব্য বেরিয়ে গিয়েছে, অভিযুক্তদের কোনো রেয়াত করা হবে না।
অন্যদিকে, বিরোধী দলনেতা তেজস্বী যাদব তোপ দেগে বলেন, “আমরা এই ঘটনায় লজ্জিত, কিন্তু সরকারের কোনও হেলদোল নেই। এই জমানায় মহিলারা কোথাও সুরক্ষিত নন।” ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে এক্স হ্যান্ডেলে রাহুল গান্ধী লিখেছেন, “এটা কোনও সংস্কৃতি হতে পারে না, এটা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কুৎসিত রূপ।” কড়া ব্যবস্থার দাবিতে অনশনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তেজ প্রতাপ যাদবও।
জামুইয়ের ঘটনার রেশ পৌঁছেছে পশ্চিমবঙ্গেও। ঘটনার কড়া নিন্দা জানিয়ে তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সোশ্যাল মিডিয়ায় লিখেছেন, ‘বিহারের ভিডিওটি দেখে আমি স্তম্ভিত ও ক্ষুব্ধ। নীতি পুলিশের নামে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি দিতে হবে।’ আক্রান্ত কিশোর-কিশোরীর উদ্দেশ্যে তিনি আরও লেখেন, ‘সেই নিষ্পাপ শিশুদের বলছি, আমি দুঃখিত, আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইছি। কারণ দেশ হিসেবে আমরা তোমাদের নিরাপত্তা দিতে চরম ব্যর্থ হয়েছি।’ রাজনৈতিক চাপানউতোর ও প্রশাসনিক টানাপোড়েনের মাঝে বর্তমানে থমথমে পুরো বিহার।
Leave a comment