০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা নস্যাৎ: জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কাছে হার মানলেন এনএসএ খলিলুর রহমান
বাংলাদেশ

সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা নস্যাৎ: জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের কাছে হার মানলেন এনএসএ খলিলুর রহমান

Share
Share

ঢাকা: বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের রদবদল ঘটিয়ে নিজস্ব বলয় তৈরির একটি সুক্ষ্ম চক্রান্ত বা ‘সফট ক্যু’ (Soft Coup) নস্যাৎ করে দিয়েছেন সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) খলিলুর রহমানের পরিকল্পিত এই চালটি ব্যর্থ করে দিয়ে সেনাপ্রধান নিজের অবস্থান এবং সেনাবাহিনীর চেইন অফ কমান্ড সুসংহত রেখেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

সেনাপ্রধান এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার মধ্যে বিরোধের শুরুটা হয়েছিল ২০২৫ সালের এপ্রিলে, যখন খলিলুর রহমান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে একটি ‘মানবিক করিডোর’ স্থাপনের জন্য জোরালো প্রস্তাব দিয়েছিলেন। তার যুক্তি ছিল, এর মাধ্যমে আরাকান আর্মিকে সাহায্য করা এবং ওষুধ ও খাদ্য সাহায্য পৌঁছানো যাবে।

তবে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান শুরু থেকেই এর তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি এই করিডোরকে ‘ব্লাডি করিডোর’ বা রক্তাক্ত পথ হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করত। এই বিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, খলিলুর রহমানের ঢাকা সেনানিবাসে প্রবেশের ওপর সেনাপ্রধান নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিলেন।

সম্প্রতি সেনাবাহিনীর দুজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার অবসরে যাওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় খলিলুর রহমান নতুন সুযোগ পান। তার লক্ষ্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে নিজের অনুগত কর্মকর্তাদের বসানো বর্তমান সিজিএস লেফটেন্যান্ট জেনারেল মিজানুর রহমান শামীম ২১ জানুয়ারি থেকে অবসরের প্রস্তুতিমূলক ছুটিতে (LPR) গেছেন। খলিলুর রহমানের পরিকল্পনা ছিল এই গুরুত্বপূর্ণ পদে (যেখানে সেনাবাহিনীর বাজেট ও অপারেশনাল ক্ষমতা থাকে) লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসানকে নিয়ে আসা। একইভাবে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (PSO) হিসেবে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোহাম্মদ ফয়জুর রহমানকে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন তিনি।

সূত্র বলছে, লেফটেন্যান্ট জেনারেল ফয়জুর রহমানের সাথে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের ঘনিষ্ঠতা রয়েছে এবং কামরুল হাসান এনএসএ খলিলুর রহমানের অত্যন্ত আস্থাভাজন। এই দুই কর্মকর্তাকে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে বসিয়ে সেনাবাহিনীর মূল নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ছক কষেছিলেন এনএসএ।

তদন্তে বেরিয়ে এসেছে যে, খলিলুর রহমান শুধুমাত্র বর্তমান সরকারকে নিয়ে ভাবছেন না, বরং তিনি সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক চাল চালছেন। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে তিনি কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রে সফর করে বিভিন্ন বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থা ও স্টেট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেন। এমনকি আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর সরকার পরিবর্তন হলেও যেন তিনি নিজের পদটি টিকিয়ে রাখতে পারেন, সেজন্য তিনি বিএনপির তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সাথেও যোগাযোগের একটি পথ তৈরি করেছিলেন বলে জানা গেছে।

একদিকে যখন অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই চলছে, অন্যদিকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধের দামামা বাজছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিয়ানমারের জান্তা বাহিনী ড্রোন ব্যবহার করে আরাকান আর্মির ওপর হামলা চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। চিন্তার বিষয় হলো, বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো এবং জান্তা বাহিনী উভয়েই মাঝে মাঝে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করছে। পরিস্থিতি এমন যে, জান্তা বাহিনী চীনের তৈরি অত্যাধুনিক ‘CASC CH3A’ ড্রোন ব্যবহার করে বাংলাদেশ সীমান্তের ভেতরেও অভিযান চালাতে পারে।

নিজের মেয়াদকাল অর্থাৎ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত সেনাবাহিনীতে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। তিনি খলিলুর রহমানের প্রস্তাবিত পদায়নগুলো আটকে দিয়ে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব রক্ষা করেছেন। প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সময়মতো এই রদবদল রুখে না দিলে সেনাবাহিনীতে বড় ধরনের বিভাজন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা ছিল।

বর্তমানে সেনাপ্রধানের কঠোর অবস্থানের কারণে এনএসএ-র পরিকল্পনা ভেস্তে গেলেও, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা তৎপরতা নিয়ে সেনাবাহিনী এখন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles