০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home কলকাতা বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা: বৈদিক যুগ থেকে আজকের বসন্ত পঞ্চমী—জানুন বিবর্তনের ইতিহাস
কলকাতালাইফস্টাইল

বিদ্যার দেবী সরস্বতীর আরাধনা: বৈদিক যুগ থেকে আজকের বসন্ত পঞ্চমী—জানুন বিবর্তনের ইতিহাস

Share
Share

বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম পবিত্র ও আনন্দময় উৎসব হলো সরস্বতী পুজো। মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে এই পুজো হয় বলে একে ‘শ্রীপঞ্চমী’ বা ‘বসন্ত পঞ্চমী’ বলা হয়। কিন্তু কীভাবে শুরু হলো এই বাগদেবীর আরাধনা? কীভাবেই বা তা হয়ে উঠল ছাত্রছাত্রীদের প্রধান উৎসব? চলুন জেনে নিই এর পেছনের ইতিহাস।

প্রাচীন ঋগ্বেদে সরস্বতী কিন্তু মূলত এক প্রবহমান নদীর নাম ছিল। বৈদিক ঋষিরা এই নদীর তীরে বসে মন্ত্র পাঠ করতেন এবং যজ্ঞ করতেন। ধীরে ধীরে নদীর পবিত্রতা এবং যজ্ঞের পবিত্রতা মিলেমিশে গিয়ে সরস্বতী হয়ে ওঠেন শুদ্ধতা ও বাণীর (বাক) দেবী। পুরাণ অনুযায়ী, তিনি দেবী আদ্যাশক্তি থেকেই উৎপন্ন এবং ব্রহ্মার মুখ থেকে তাঁর সৃষ্টি। তাঁর হাতে বীণা যেমন সুরের প্রতীক, তেমনি পুস্তক জ্ঞানের এবং অক্ষমালা আধ্যাত্মিক সাধনার প্রতীক।

প্রাচীনকালে বৌদ্ধ এবং হিন্দু উভয় ধর্মের তান্ত্রিক সাধকেরাই সরস্বতী দেবীর পুজো করতেন। তবে তখন তিনি মূলত ‘বাগেশ্বরী’ বা ‘নীল সরস্বতী’ রূপে পূজিত হতেন। সেই পুজোর পদ্ধতি আজকের মতো উৎসবমুখর ছিল না, বরং তা ছিল গভীর সাধনার বিষয়।

বাংলার ঘরে ঘরে সরস্বতী পুজোর বর্তমান রূপটি খুব বেশি প্রাচীন নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীতেও (১৮০০ সালের দিকে) মাটির মূর্তির চল তেমন ছিল না। তখন পাঠশালাগুলোতে প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমীতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার বান্ডিল, দোয়াত ও কলম রেখে পুজো করা হতো। ছাত্ররা কাঠের স্লেট বা বইয়ের ওপর চন্দনের ফোঁটা দিয়ে দেবীকে স্মরণ করত।

বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বড় শহরগুলোতে বিত্তশালী ব্যক্তিদের হাত ধরে প্রতিমা পুজোর প্রচলন শুরু হয়। এরপর বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে বিভিন্ন স্কুল-কলেজ ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ঘটা করে পুজোর আয়োজন শুরু হলে এটি সর্বজনীন উৎসবে পরিণত হয়।

সরস্বতী পুজোয় কিছু নির্দিষ্ট নিয়ম ও উপকরণের ব্যবহার একে অন্যান্য পুজো থেকে আলাদা করে, দেবীর গায়ের রঙ যেমন তপ্ত কাঞ্চন (সোনা), তেমনি পুজোয় বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল এবং অভ্র-আবীর আবশ্যিক। বসন্তের আগমনের প্রতীক হিসেবে দেবীকে আমের মুকুল নিবেদন করা হয়। গ্রামবাংলার এক প্রচলিত বিশ্বাস হলো, পুজোর আগে ‘কুল’ খাওয়া যাবে না। পুজোর দিন কুল নিবেদন করে তবেই ছাত্রছাত্রীরা কুল খায়। ছোট শিশুদের পড়াশোনার শুরু হয় এই দিনে ‘হাতেখড়ি’র মাধ্যমে। পুজোর পরদিন দই-চিড়ে মেখে ‘দধিকর্মা’ খাওয়ার মাধ্যমে পুজোর সমাপ্তি ঘটে।

আজকের দিনে সরস্বতী পুজো মানেই ছাত্রছাত্রীদের কাছে এক বিশেষ দিন। বই-খাতা দেবীর পায়ে সঁপে দিয়ে পড়া থেকে একদিনের ছুটি। হলুদ শাড়ি আর পাঞ্জাবি পরে দলবেঁধে পুষ্পাঞ্জলি দেওয়া এবং বিকেলে বন্ধুদের সাথে ঠাকুর দেখতে যাওয়া বাঙালির সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জ্ঞান, সঙ্গীত ও কলার এই আরাধনা যুগে যুগে আমাদের অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার প্রেরণা দেয়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *