০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home বাংলাদেশ এডিটর'স চয়েস বার্তাকক্ষ থেকে তথ্য যাচাইয়ের লড়াই, বদলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের সাক্ষী কামাল শাহরিয়ার
এডিটর'স চয়েসবাংলাদেশ

বার্তাকক্ষ থেকে তথ্য যাচাইয়ের লড়াই, বদলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের সাক্ষী কামাল শাহরিয়ার

Share
বার্তাকক্ষ থেকে তথ্য যাচাইয়ের লড়াই, বদলে যাওয়া সংবাদমাধ্যমের সাক্ষী কামাল শাহরিয়ার
Share

দক্ষিণ এশিয়ার সংবাদমাধ্যম গত দেড় দশকে একাধিক বড় পরিবর্তনের সাক্ষী। প্রিন্ট সাংবাদিকতার প্রভাব থেকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উত্থান, ২৪ ঘণ্টার টেলিভিশন সংবাদ থেকে সামাজিক মাধ্যমে তথ্যের বিস্ফোরণ, আবার সাম্প্রতিক সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার, সব মিলিয়ে বদলে গিয়েছে সংবাদ পরিবেশনের ধরন। এই পরিবর্তনের নানা পর্বের সঙ্গে নিবিড় ভাবে যুক্ত থেকেছেন বাংলাদেশি সাংবাদিক ও মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট পেশাজীবী কামাল শাহরিয়ার (মোহাম্মদ কামাল হোসাইন)।

বর্তমানে তিনি BBC Media Action Bangladesh-এ মিডিয়া ডেভেলপমেন্ট অফিসার হিসেবে কাজ করছেন। তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা, ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি, ফ্যাক্ট-চেকিং, সাংবাদিক প্রশিক্ষণ, সংবাদকর্মীদের সুরক্ষা, ক্লাইমেট কমিউনিকেশন এবং সংবাদমাধ্যমের দক্ষতা উন্নয়ন তাঁর কাজের প্রধান ক্ষেত্র।

সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশনের পর্দায়

কামালের সাংবাদিকতা জীবনের শুরু প্রিন্ট মিডিয়ায়। কর্মজীবনের প্রথম দিকে তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন সংবাদপত্র দৈনিক ইত্তেফাক এবং দৈনিক সংবাদ-এ কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন সাংবাদিকতায় যোগ দিয়ে সময় টিভি, কলকাতা টিভি এবং এখন টিভি-সহ একাধিক সংবাদমাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান।

টেলিভিশন সাংবাদিকতার সময়ে শুধুমাত্র রিপোর্টিং নয়, সংবাদ পরিকল্পনা, নিউজরুম সমন্বয়, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট নির্মাণ, লাইভ সম্প্রচার এবং দেশজুড়ে সংবাদদাতাদের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজেও যুক্ত ছিলেন তিনি। একই সঙ্গে ‘অদম্য বাংলাদেশ’, ‘তারুণ্যের সময়’ এবং ‘সাম্প্রতিক ভাবনা’র মতো অনুষ্ঠানেও কাজ করেছেন।

নির্বাচন, তরুণদের উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন, সামাজিক অগ্রগতি ও জননীতি সংক্রান্ত নানা বিষয়ে প্রতিবেদন ও বিশেষ অনুষ্ঠান নির্মাণের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

সংবাদমাধ্যম শুধু খবর নয়, পরিবর্তনেরও হাতিয়ার

সাংবাদিকতার গণ্ডি পেরিয়েও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত রয়েছেন কামাল শাহরিয়ার। যুবসমাজের অংশগ্রহণ, নারী ক্ষমতায়ন, লিঙ্গসমতা এবং সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচিতে যোগাযোগ ও সংবাদমাধ্যমকে কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন তিনি।

তাঁর বিশ্বাস, সংবাদমাধ্যমের কাজ শুধু ঘটনা তুলে ধরা নয়। সমাজের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলি জনপরিসরে নিয়ে আসা এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের পরিবেশ তৈরিও সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বের অংশ।

ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে ফ্যাক্ট-চেকিংয়ের লড়াই

ডিজিটাল যুগে তথ্যের প্রবাহ যত বেড়েছে, ততই বেড়েছে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ভুয়ো খবর, ম্যানিপুলেটেড ছবি-ভিডিয়ো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের ঝুঁকি। এই প্রেক্ষাপটে তথ্য যাচাই এবং ডিজিটাল ভেরিফিকেশনকে নিজের কাজের অন্যতম অগ্রাধিকারে পরিণত করেছেন কামাল।

পেশাগত উন্নয়নের অংশ হিসেবে তিনি যুক্তরাজ্যে BBC Verify দলের সঙ্গে একটি পেশাগত প্লেসমেন্টে অংশ নেন। সেখানে ওপেন সোর্স ইনভেস্টিগেশন (OSINT), ডিজিটাল ভেরিফিকেশন, ছবি ও ভিডিয়ো যাচাই, জিও-লোকেশন বিশ্লেষণ এবং অনলাইন তথ্য অনুসন্ধানের আধুনিক পদ্ধতি সম্পর্কে হাতে-কলমে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। তাঁর মতে, বর্তমান সময়ে তথ্য সংগ্রহের মতোই গুরুত্বপূর্ণ সেই তথ্যের সত্যতা যাচাই করার দক্ষতা।

প্রশিক্ষণেই গড়ে উঠছে তথ্য-সচেতনতা

BBC Media Action-এ যুক্ত হওয়ার পর সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের দক্ষতা বৃদ্ধির কাজেও সক্রিয় ভূমিকা নিয়েছেন কামাল শাহরিয়ার। এ পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের অন্তত ২৫০ জন সাংবাদিক এবং ১৫০ জনেরও বেশি সিভিল সোসাইটি প্রতিনিধি, মানবাধিকারকর্মী ও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনের উন্নয়নকর্মীকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

এই প্রশিক্ষণগুলির বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি, অনলাইন ও অফলাইন তথ্য যাচাই, ছবি ও ভিডিয়ো ফ্যাক্ট-চেকিং, জিও-লোকেশন ট্রেসিং, ওপেন সোর্স অনুসন্ধান, ডিজিটাল নিরাপত্তা, ভুয়ো তথ্য মোকাবিলা এবং দায়িত্বশীল ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার।

কামালের মতে, ভুয়ো তথ্যের বিরুদ্ধে লড়াই কেবল সাংবাদিকদের একার দায়িত্ব নয়। সাধারণ মানুষ, কমিউনিটি সংগঠন এবং নাগরিক সমাজের মধ্যেও তথ্য যাচাইয়ের সংস্কৃতি গড়ে তোলা প্রয়োজন। সেই কারণেই সাংবাদিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি সিভিল সোসাইটি ও কমিউনিটি নেতাদের প্রশিক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

২০২৪: কর্মজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

কর্মজীবনের দীর্ঘ পথে নানা সাফল্যের পাশাপাশি চ্যালেঞ্জও এসেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় সংবাদমাধ্যম শিল্পও এক অনিশ্চয়তার পর্যায়ের মধ্যে দিয়ে যায়।

সেই সময় সময় টিভি-র পাঁচ জন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের একজন হিসেবে চাকরি হারান কামাল শাহরিয়ার। ঘটনাটি বাংলাদেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও আলোচিত হয়েছিল। তবে সেই অভিজ্ঞতাকে তিনি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ধাক্কা হিসেবে দেখেন না।

বরং তাঁর মতে, এই ঘটনাই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা, সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা এবং শক্তিশালী সম্পাদকীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে তাঁকে আরও বেশি সচেতন করেছে।

সাংবাদিক নিরাপত্তা ও সংবাদকক্ষের ভবিষ্যৎ

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সাংবাদিকদের সুরক্ষা, অনলাইন হেনস্থা, রাজনৈতিক চাপ এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা নিয়ে আলোচনা বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে সংবাদমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন কামাল।

তাঁর মতে, শক্তিশালী সাংবাদিকতা শুধু দক্ষ ব্যক্তির উপর নির্ভর করে না; প্রয়োজন স্বাধীন ও নিরাপদভাবে কাজ করার সুযোগও।

ক্লাইমেট কমিউনিকেশনেও সক্রিয়

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য ক্লাইমেট কমিউনিকেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

বন্যা, ঘূর্ণিঝড় বা তাপপ্রবাহের মতো পরিস্থিতিতে শুধু ক্ষয়ক্ষতির খবর নয়, আগাম প্রস্তুতি, ঝুঁকি এবং করণীয় সম্পর্কিত তথ্যও মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব বলে মনে করেন কামাল।

ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং নতুন প্রযুক্তি সংবাদ পরিবেশনের ধরন দ্রুত বদলে দিচ্ছে। তবে সাংবাদিকতার মৌলিক দায়িত্ব বদলায় না বলেই বিশ্বাস তাঁর।

কামাল শাহরিয়ারের কথায়, “প্রযুক্তি যতই এগিয়ে যাক না কেন, মানুষের কাছে যাচাই করা এবং বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পৌঁছে দেওয়ার প্রয়োজন কখনও ফুরোবে না।”

সংবাদপত্র থেকে টেলিভিশন, সেখান থেকে ডিজিটাল মিডিয়া এবং বর্তমানে মিডিয়া ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্র। কামাল শাহরিয়ারের কর্মজীবনের পথচলা আসলে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমেরও এক প্রতিচ্ছবি। আর সেই যাত্রার কেন্দ্রে রয়েছে একটি প্রশ্ন, তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থা কীভাবে আরও শক্তিশালী করা যায়।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Related Articles