০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home পশ্চিমবঙ্গ উৎসব পাথর-ধাতু বাদ দিয়ে কেন নিমকাঠের জগন্নাথ? বিশ্বকর্মার সেই শর্তের আসল রহস্য কী?
উৎসবপশ্চিমবঙ্গশিল্প

পাথর-ধাতু বাদ দিয়ে কেন নিমকাঠের জগন্নাথ? বিশ্বকর্মার সেই শর্তের আসল রহস্য কী?

Share
পাথর-ধাতু বাদ দিয়ে কেন নিমকাঠের জগন্নাথ? বিশ্বকর্মার সেই শর্তের আসল রহস্য কী?
ছবি সংগৃহীত
Share

পুরী: হাওয়ার বিপরীতে মন্দিরের ধ্বজা ওড়া থেকে শুরু করে সমুদ্রদেবের দর্শন পাওয়ার আকুলতা— ওড়িশার পুরীর জগন্নাথ ধামের লীলাকথার যেন কোনো শেষ নেই। তবে এই সব অলৌকিক ঘটনার পাশাপাশি জগন্নাথ সংস্কৃতির সবচেয়ে বড় বিস্ময় লুকিয়ে রয়েছে খোদ গর্ভগৃহে। ভারতের অধিকাংশ হিন্দু মন্দিরে যেখানে পাথর বা ধাতুর বিগ্রহ পূজিত হয়, সেখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা দেবীর মূর্তি তৈরি হয় সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে। তাও আবার যে সে কাঠ নয়, বিশেষ লক্ষণযুক্ত নিমকাঠ। এই নিমকাঠের মূর্তির নেপথ্যে যেমন রয়েছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ইতিহাস, তেমনই এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মানব জীবনের এক গভীর দর্শন।

[TECHTARANGA-POST:10995]

জগন্নাথ সংস্কৃতিতে এই নিমকাঠকে বলা হয় ‘দারু ব্রহ্ম’, যার অর্থ কাঠে পরম চৈতন্যের অধিষ্ঠান। পুরাণ ও লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই প্রথার সূচনা হয়েছিল মালব দেশের রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন-এর হাত ধরে। স্বপ্নে ভগবান বিষ্ণুর নির্দেশ পেয়ে রাজা যখন পুরীতে মহামন্দির নির্মাণ করেন, তখন মূর্তি গড়ার জন্য সমুদ্রতটে ভেসে আসে এক অলৌকিক নিমকাঠের গুঁড়ি। কিন্তু সেই কাঠ খোদাই করে মূর্তি গড়বে কে? তখনই ছুতোরের বেশে হাজির হন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা। তবে তাঁর শর্ত ছিল, বন্ধ দরজার আড়ালে ২১ দিন ধরে তিনি মূর্তি গড়বেন এবং তার আগে কেউ সেখানে উঁকি দিতে পারবেন না। কিন্তু দিনকয়েক পর ভিতর থেকে কোনো শব্দ না পেয়ে উদ্বিগ্ন রাজা শর্ত ভেঙে মন্দিরের দরজা খুলে ফেলেন। আর তখনই অন্তর্ধান হন বিশ্বকর্মা। দেখা যায়, বিগ্রহগুলির হাত-পা তখনও পূর্ণাঙ্গ হয়নি। রাজা নিজের ভুলে অনুতপ্ত হলেও দৈববাণী হয় যে, প্রভু এই অসম্পূর্ণ রূপেই পূজিত হতে চান। সেই থেকে আজও এই রূপেই পুজো পেয়ে আসছেন জগন্নাথদেব।

[TECHTARANGA-POST:10923]

তবে শুধু ইতিহাস নয়, এই নিমকাঠের মূর্তি নির্বাচনের পেছনে রয়েছে কঠোর গোপনীয়তা ও আধ্যাত্মিক নিয়ম। প্রতি ১২ থেকে ১৯ বছর অন্তর ‘নবকলেবর’ উৎসবের মাধ্যমে পুরোনো মূর্তি বদলে নতুন নিমকাঠের বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা করা হয়। যে কোনো নিমগাছ হলেই চলে না; কানন বা জঙ্গলে খুঁজে বের করতে হয় এমন গাছ যাতে শঙ্খ, চক্র, গদা বা পদ্মের মতো শুভ দৈব চিহ্ন রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই নবকলেবর উৎসব এবং কাঠের তৈরি অসম্পূর্ণ মূর্তি আসলে মানব জীবনের এক পরম সত্যকে তুলে ধরে। পাথর বা ধাতুর মতো এই মূর্তি চিরস্থায়ী নয়, যা মানুষের জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্মের চিরন্তন জীবনদর্শনকে প্রতীকায়িত করে। ঈশ্বরের এই অনন্য রূপই প্রমাণ করে যে, জীবনের অসম্পূর্ণতার মাঝেই লুকিয়ে থাকে পরম পূর্ণতা।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *