০৫
আশ্বিন • October
রবিবার / Sunday
October 05, 2026
11:35:00 PM • রাত ১১:৩৫
Home ধর্ম ও বিশ্বাস উৎসব গোপালের ভোগে মাখন-মিছরি দেওয়ার আসল কারণ জানলে চমকে যাবেন!
উৎসবধর্ম ও বিশ্বাসধর্ম ও বিশ্বাস

গোপালের ভোগে মাখন-মিছরি দেওয়ার আসল কারণ জানলে চমকে যাবেন!

Share
Share

কলকাতা: বেশিরভাগ হিন্দু বাড়িতেই গোপাল থাকে। ননীচোরা গোপালকে একেবারে নিজের সন্তানের মতো লালন পালন করেন বহু গৃহস্থ। তাকে যেমন পছন্দের খাবারদাবার দেওয়া হয়। আবার আলাদা বিছানা, বালিশে ঘুম পাড়ানোও হয়। বাড়ির খুদে সদস্যের মতো তার হাতে চকোলেট, লাড্ডু দেওয়া হয়। তবে আপনি কি মাঝেমধ্যেই গোপালের প্রিয় মাখন, মিছরি দিতে ভুলে যাচ্ছেন?

সনাতন ধর্মে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের এই পবিত্র অষ্টমী তিথিটির গুরুত্ব ভক্তদের হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা জুড়ে রয়েছে। বিশ্বাস করা হয়, ঘোর অন্ধকারের মধ্যরাতে রোহিণী নক্ষত্রে মথুরার কারাগারে কংসের বন্দিশালায় ধরাধামে আবির্ভূত হয়েছিলেন ভগবান বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ। সেই শুভ আবির্ভাব তিথি উপলক্ষে দেশজুড়ে ঘরে ঘরে এবং মন্দিরে মন্দিরে পরম স্নেহে ও ভক্তিভরে পালিত হচ্ছে জন্মাষ্টমী উৎসব। এই বিশেষ দিনে ভক্তরা নিজেদের ঘরের ছোট্ট লাড্ডু গোপালকে স্নান করিয়ে, নতুন পোশাকে সাজিয়ে নানা রকমের সুস্বাদু খাবারের থালা নিবেদন করেন। সেই ভোগের তালিকায় ময়দা ও ঘি দিয়ে তৈরি ঐতিহ্যবাহী পনজিরি, দই দিয়ে তৈরি সুস্বাদু শ্রীখণ্ড, রাধারানির হাতের পছন্দের মালপোয়া কিংবা রসে ভরা মোহনভোগ— অনেক কিছুই জায়গা পায়। তবে এই সমস্ত উপচারের মধ্যেও গোপালের ভোগের থালায় এক বাটি মাখন আর মিছরির উপস্থিতি যেন একেবারেই অবধারিত। ননীচোরা গোপালের সামনে মাখন-মিছরি না দিলে যেন পুজোয় কোথাও একটা অপূর্ণতা রয়ে যায়। কিন্তু কেবল বালগোপাল খেতে ভালোবাসতেন বলেই কি যুগ যুগ ধরে এই ভোগ দেওয়া হয়, নাকি এর নেপথ্যে জড়িয়ে রয়েছে কোনো সুন্দর ও গভীর আধ্যাত্মিক অর্থ?

পৌরাণিক কাহিনী ও বৈষ্ণব সাহিত্যের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, গোকুল ও বৃন্দাবনে কৃষ্ণের শৈশবের দিনগুলো কেটেছিল পরম আনন্দে ও দুষ্টুমিতে। সেই দিনগুলির অন্যতম মধুর অধ্যায় ছিল তাঁর মাখন চুরির ঘটনা, যাকে বৈষ্ণব শাস্ত্রে বলা হয় নবনীতচুরি। যশোদা মায়ের চোখ এড়িয়ে গোপীদের ঘরের উঁচুতে ঝুলিয়ে রাখা হাঁড়ি থেকে বন্ধুদের কাঁধে চেপে সদ্য তোলা ননী চুরি করে খেতেন ছোট্ট কৃষ্ণ। নিজেও খেতেন, আবার ভালোবেসে সমস্ত সখাদের মুখেও তুলে দিতেন। সেই মিষ্টি দুষ্টুমির জন্যই তাঁর নাম হয়ে ওঠে মাখনচোর বা নবনীতচোর। তবে ধর্মীয় পণ্ডিত ও ভক্তদের মতে, কৃষ্ণের এই বাল্যলীলার ভেতরে রয়েছে মানুষের মনের এক অপার সত্য। দুধকে যখন ধৈর্য ধরে বারবার মন্থন করা হয়, তখন তার সমস্ত জলীয় অংশ আলাদা হয়ে ওপরে ভেসে ওঠে সবচেয়ে বিশুদ্ধ, কোমল ও খাঁটি মাখন। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে এই মাখন হল মানুষের সমস্ত অহংকার ও মলিনতা দূর করে পাওয়া একেবারে নির্মল এক হৃদয়। শ্রীকৃষ্ণ ভক্তদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে আসলে সেই খাঁটি ও নিষ্পাপ হৃদয়টিকেই নিজের প্রেমে চুরি করে নিতেন।

আর এই মাখনের সঙ্গেই যুক্ত হয় স্ফটিকের মতো ধবধবে সাদা ও মিষ্টি মিছরি। শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নির্মল হৃদয়ে যখন ঈশ্বরের প্রতি অচলা ভক্তি জন্ম নেয়, তখন জীবনের সমস্ত তিক্ততা দূর হয়ে সেখানে নেমে আসে এক মিষ্টি পরম শান্তি। মাখনের সারল্যের সঙ্গে মিছরির সেই মিষ্টি স্বাদ যেন ভক্ত ও ভগবানের মধ্যকার মধুর সম্পর্কেরই পরিচয় বহন করে। দেশজুড়ে ভৌগোলিক বৈচিত্র্য কিংবা বিভিন্ন পরিবারের নিজস্ব নিয়ম অনুযায়ী জন্মাষ্টমীর ভোগে হয়তো দুধ, দই, পায়েস কিংবা ছানার নানা মিষ্টি দেওয়া হয়; শাস্ত্রে কোথাও এমন কোনো কড়া নিয়মও লেখা নেই যে মাখন-মিছরি ছাড়া পুজো হবেই না। তবুও বৃন্দাবনের সেই রাখাল রাজার প্রতি অপরিসীম বাৎসল্য ও টান থেকেই আজও মানুষ পরম আদরে গোপালের পাতে তুলে দেন এক টুকরো তাজা মাখন আর মিছরি। কারণ ভক্তের কাছে এই এক টুকরো মাখন নিছক কোনো খাবার নয়, এ হল গোকুলের সেই দুরন্ত বালকের স্মৃতি আর নিজের হৃদয়কে ভগবানের চরণে সঁপে দেওয়ার এক পরম অনুভূতি।

হিডেন স্টোরিজ নিউজ

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *